দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের আগে দুই দেশের বাণিজ্যিক অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত চার মাসে বিশ্ববাজারে চীনের বাণিজ্য আরও বেড়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠেয় বৈঠক থেকে বড় ধরনের ছাড় পাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা কমেছে। তাইওয়ানসহ বিভিন্ন জটিল ইস্যু আলোচনায় উঠতে পারে। তবে বৈঠকের প্রধান বিষয় হতে পারে গত বছর করা বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানো যায় কি না।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ জন জিন বলেন, শি জিনপিং তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছেন না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতা ধরে রেখে চীনকে নিজেদের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার সময় দিতে চান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনাকে গুরুত্ব কম দিয়ে দেখছেন। রোববার নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের নেতৃত্বে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও বাণিজ্যিক নয় এমন পণ্যের বাণিজ্য নিয়ে সম্ভাব্য কিছু চুক্তির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অথচ ২০২৫ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলায় শুল্ককে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে একই বছরের অক্টোবরে শির সঙ্গে বাণিজ্যবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধসহ বিভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ট্রাম্প।
অন্যদিকে চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকটের মতো সমস্যা থাকলেও দেশটির রপ্তানি শক্তিশালী রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকে পরিস্থিতিকে ‘চায়না শক ২.০’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র শিন ও টেমুর মতো অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের ব্যবহৃত কমমূল্যের ছোট প্যাকেজ নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সফল হলেও চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রে চীন যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ধরনের পণ্য রপ্তানি করেছে, তার অর্ধেকের বেশি পণ্যের বিক্রি ২০২৫ সালের তুলনায় বেড়েছে।
চীনা ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধিদলও শির সঙ্গে ওয়াশিংটন সফরে যেতে পারে। ওই দলে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারিতে থাকা কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিও থাকতে পারেন বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ স্কট কেনেডির মতে, চীনকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র যে একতরফা চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছিল, তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
বাণিজ্য আলোচনার পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যুও দুই নেতার বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে তাইওয়ান নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান নরম করার চেষ্টা করতে পারেন।
গত মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শির বৈঠকের সময় তাইওয়ান নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন শি। এর মধ্যে তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজকে চীনের সঙ্গে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।
তাইওয়ান ও জাপানের কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে ট্রাম্প এই বিষয়টি ব্যবহার করতে পারেন। এর বিনিময়ে চীনের কাছ থেকে বোয়িংয়ের বিমান বা মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে মাদকসংকট সৃষ্টিকারী ফেন্টানিল তৈরির রাসায়নিকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ চাওয়া হতে পারে।
সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উ শিনবো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক আরও লেনদেননির্ভর হয়ে উঠেছে। তার মতে, ওয়াশিংটন বাণিজ্য আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিলেও বেইজিংয়ের কাছে তাইওয়ান ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে চাপ তৈরির ক্ষেত্রে চীনের প্রেসিডেন্টের প্রভাব কাজে লাগাতে চায় ওয়াশিংটন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে শির আগ্রহ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে চলতি মাসে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানে বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিক্রি করছে চীন। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থার বিষয়ে অবগত নয় বলে জানিয়েছে।
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট এটিকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের বিরুদ্ধে এখনো এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে অন্য পররাষ্ট্রনীতির বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়ার সময় ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে আগ্রহী। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক শি জিনপিংয়ের জন্যও সুবিধাজনক।
টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জের জ্যেষ্ঠ ভূরাজনৈতিক গবেষক রুবি ওসমানের মতে, দুই নেতাই মনে করেন সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকলে তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারবেন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেটি ইরান, আর শির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পরবর্তী সময়ের জন্য চীনের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/